একটি লাইভ, ২৫ লাখ টাকা এবং হাজারো মুখের হাসি…

করোনার মধ্যে বন্যার হানায় পানিবন্দি যখন দেশের লাখো মানুষ। এসব মানুষের পাশে দাঁড়াতে নিলামের উদ্দেশ্যে লোকসংগীতশিল্পী ইমরান হোসাইন এগিয়ে এসেছেন নিজের প্রিয় ইউকেলেল নিয়ে। একটি লাইভ এবং হাজারো মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর গল্পের সংবাদটা অনেকেরই জানা। নিজের বয়ানে এ গল্পই জানাচ্ছেন ইমরান…

এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে করোনার প্রভাব যখন ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে শুরু করে। চারদিকে কর্মহীন হয়ে পড়া লাখো মানুষের কত হাহাকারের শব্দ, হাহাকারের গল্প। একবেলা পেট ভরে খেতে পারাটাও অনেকের কাছে কোটি টাকা পাওয়ার মতো। দিশেহারা মানুষগুলোর সাহায্যে এগিয়ে আসা সামাজিক সংগঠনগুলোর অবস্থাও দিশেহারা। লক্ষাধিক মানুষের কর্মহীন হয়ে পড়ার সময়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যুক্ত হলো নতুন এক শব্দ ‘নিলাম’। মানুষকে সহায়তায় নিজেদের প্রিয় সামগ্রী নিয়ে এগিয়ে এসেছেন দেশের অনেক তারকা। একটিই উদ্দেশ্য, নিলামের মাধ্যমে যদি হয় লাখো মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর কারণ।

করোনার শুরু থেকেই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। করোনার মধ্যে বন্যা বিষয়টা মোটেই সহজ নয়। এবার বন্যাদুর্গতদের সহায়তার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করলাম। পরিসরটিকে আরও বড় করতে চেয়েছি। আমার জন্য নিলামটা মুখ্য নয়, খুঁজছিলাম একটি ইস্যু। প্রিয় ইউকেলেলটির বেছে নিলাম সাতপাঁচ না ভেবে। আমার কেনা প্রথম ইউকেলেল যেটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো স্মৃতি, যেটি সাহায্য করেছে অনেক শিশুশিল্পীকে সবার সামনে তুলে ধরে আনতে। যেহেতু ‘নিলাম’ ধারণাটি আমাদের জন্য নতুন, কাজেই ব্যাপারটা সহজ কিছুও নয়। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। আগ্রহ দেখান করপোরেট ব্যক্তিত্ব প্রিয় তানভীর শাহরিয়ার রিমন ভাইয়া। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তার ফেসবুকভিত্তিক শো ‘কানেক্ট দ্য ডটস’-এ লাইভ শোর মাধ্যমে তা পরিচালিত হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী রিমন ভাইয়ের সঙ্গে লাইভ অনুষ্ঠানটিতে অভিনেতা বন্ধু শামিম হাসান সরকার, মৌসুমী হামিদ, ফাহাদ লোকমানসহ অংশ নিই। লক্ষ্য বন্যাদুর্গতের মুখে খানিকটা হাসি ফোটানো। ধারণা ছিল, হয়তো দুই কিংবা তিন লাখ টাকা উঠবে। তবে ধারণাটা আসলেই ভুল ছিল। লাইভে অনুষ্ঠান দেখে যুক্ত হন চট্টগ্রাম কর্ণফুলী ফাউন্ডেশনের দু’জন সহপ্রতিষ্ঠাতা সাফিয়া গাজী রহমান ও রোটারিয়ান রাশেদুল আমিন। তারা তাদের ফাউন্ডেশন থেকে দুই হাজার তৈরি পোশাক ও ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কাজী আইটির চেয়ারম্যান মাইক কাজী ৪০ হাজার টাকা, কানেক্ট দ্য ডটসের সহপ্রতিষ্ঠাতা রোকসানা শাহরিয়ার ৫০ হাজার টাকা এবং কানাডাপ্রবাসী ব্যবসায়ী ইফতি এক হাজার ডলার যুক্ত করেন। এতেই শেষ নয়। অনুষ্ঠানের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাংলাদেশিদের চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি প্রকৌশলী চন্দ্রনাথ দাদা জানান, তাদের ফাউন্ডেশনের ১৫ লাখ টাকার ত্রাণ দেওয়ার কথা সঙ্গে আরেকজন তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী এগিয়ে আসেন দুই হাজার পিস তৈরি পোশাক নিয়ে। চট্টগ্রামভিত্তিক ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এলভিয়ন গ্রুপ যোগ দেয় জরুরি ওষুধ সরবরাহে। সর্বমোট উঠে ২৫ লাখ টাকা সমমূল্যের সামগ্রী! কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষাটাই হারিয়ে ফেলেছি রীতিমতো। এই লেখাটি লেখার সময়ও রীতিমতো অবাক লাগছিল। ‘ধন্যবাদ’ জানানো ছাড়া আমার কাছে আর কোনো ভাষা নেই। বাকিটা শেষেই বলছি। সবাই তাদের কথা রেখেছেন। শুরু হলো নতুন যাত্রা, নতুন লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলা। বন্যাদুর্গত ২১টি জেলাকে সামনে রেখে টাঙ্গাইল থেকে শুরু করি যাত্রা। সঙ্গে আছে আমার সংগঠন মেড ইন বাংলাদেশ, মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এবং কানেক্ট দ্য ডটস ফাউন্ডেশন। একদম প্রকৃত ভুক্তভোগীদের লক্ষ্য করে ছুটে যাই বন্যা উপদ্রুত এলাকার গভীরে। প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে বিভিন্ন সামগ্রী পৌঁছে দেই, তাদের গল্প শুনেছি, শুনেছি তাদের হাহাকারের গল্প।

রাত প্রায় ২টা, লেখাটি লেখছি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বসে। আমাদের সামগ্রী পেয়ে তাদের মুখের হাসিটা দেখে অন্যরকম আনন্দ পাচ্ছি, এটার জন্যই যে ছুটেছি এত পথ। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে সক্ষম হবো যা আমার জীবনের অনেক বড় একটি প্রাপ্তি। কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার নেই। সবার নাম বলেও শেষ করা সম্ভব নয়। শুধু এটাই বলব, যারা সঙ্গে আছেন, আপনারা সবাই এই উদ্যোগের পেছনের শক্তি, আমার এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা।

শ্রুতিলিখন :: কৌশিক

Share With Your Community